০২:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নীলফামারীর ডোমার বিএডিসিতে নতুন জাতের বীজআলু উৎপাদন 

নীলফামারী প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৩:৩৭:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ২৬ Time View

 

টিস্যু কালচারের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আলুবীজ উৎপাদনে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে নীলফামারীর ডোমার ভিত্তি আলুবীজ খামার। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই খামারটি বর্তমানে দেশের কৃষিখাতে ভাইরাসমুক্ত ও উচ্চফলনশীল আলুবীজ সরবরাহের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে।

 

ডোমার খামারের মূল শক্তি এর সাতটি অত্যাধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি। দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে এখানে প্রতিবছর প্রায় ১৭-১৮টি উন্নত জাতের ২৫ লাখ ভাইরাসমুক্ত প্লান্টলেট উৎপাদিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদিত এই প্লান্টলেটগুলো থেকেই পর্যায়ক্রমে মিনিটিউবার, প্রাক-ভিত্তি, ভিত্তি ও প্রত্যায়িত আলুবীজ তৈরি করা হয়। চলতি মৌসুমেও ২৫ লাখ প্লান্টলেট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। ১৯৫৭-৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই খামারে দীর্ঘকাল সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ চললেও ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে আলুবীজ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এর কার্যক্রমে আমূল পরিবর্তন আসে। বর্তমানে ডোমার খামারের নিজস্ব আয়তন ৫১৪.৪৮ একর এবং পার্শ্ববর্তী দেবীগঞ্জে আরও ৮৬.২৯ একর জমিতে বীজ উৎপাদন কার্যক্রম বিস্তৃত। খামারের প্রতি ইঞ্চি জমিকে চাষাবাদের আওতায় এনে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় অনন্য অবদান রাখা হচ্ছে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার এই খামারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পটেটো প্লান্টার দিয়ে বীজ রোপণ, ডিগার দিয়ে আলু উত্তোলন এবং গ্রেডার মেশিনের মাধ্যমে বীজ আলু বাছাই করা হয়। উৎপাদিত এই বিশাল পরিমাণ বীজ সংরক্ষণের জন্য নিজস্ব হিমাগারের পাশাপাশি সারাদেশে বিএডিসির ৩২টি হিমাগার

 

জোন ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন মানসম্মত আলুবীজ দেশের প্রান্তিক কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

চলতি মৌসুমে খামারটিতে মোট ১৮টি উন্নত জাতের আলু চাষ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছেড় বিএডিসি আলু-১ (সানসাইন), আলু-৩ (সানতানা), আলু-৬ (কুমবিকা), আলু-৭ (কুইন অ্যানি), আলু-৮ (লেবেলা), বারিআলু-৭ (ডায়মন্ট), বারিআলু-৮ (কার্ডিনাল), বারিআলু-১৩ (গ্রানোলা), বারিআলু-২৫ (এস্টারিক্স), বারিআলু-২৯ (কারেজ),

 

বারিআলু-২৮ (লেডিরোসেটা), বারিআলু-৫৪ (মিউজিকা), বারিআলু-৮৫ (৭ ফোর ৭), বারিআলু-৯০ (এলোয়েট), সাগিত, বারিআলু-৬২ ও বারিআলু-৮৬। খামারটির উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও ল্যাব আধুনিকীকরণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপপরিচালক মো. আবু তালেব মিঞা। তাঁর অধীনে খামারের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, “ডোমার ভিত্তি আলুবীজ উৎপাদন খামার দেশের আলুবীজ উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি চালানো হয় যাতে কৃষকরা শতভাগ ভাইরাসমুক্ত বীজ পায়। দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় আমরা যে ভূমিকা রাখছি, এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।” খামারের ডিএডি রতন কুমার রায় জানান, মাঠপর্যায়ে বর্তমানে রোপণ ও হার্ডেনিং কার্যক্রম দ্রুতগতিতে চলছে এবং শীঘ্রই হারভেস্ট (আলু উত্তোলন) শুরু হবে।

 

উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে ডোমার খামার বাংলাদেশের আলু উৎপাদনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষিকে এগিয়ে নিতে এই খামারটির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

নীলফামারীর ডোমার বিএডিসিতে নতুন জাতের বীজআলু উৎপাদন 

Update Time : ০৩:৩৭:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

 

টিস্যু কালচারের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আলুবীজ উৎপাদনে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে নীলফামারীর ডোমার ভিত্তি আলুবীজ খামার। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই খামারটি বর্তমানে দেশের কৃষিখাতে ভাইরাসমুক্ত ও উচ্চফলনশীল আলুবীজ সরবরাহের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে।

 

ডোমার খামারের মূল শক্তি এর সাতটি অত্যাধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি। দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে এখানে প্রতিবছর প্রায় ১৭-১৮টি উন্নত জাতের ২৫ লাখ ভাইরাসমুক্ত প্লান্টলেট উৎপাদিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদিত এই প্লান্টলেটগুলো থেকেই পর্যায়ক্রমে মিনিটিউবার, প্রাক-ভিত্তি, ভিত্তি ও প্রত্যায়িত আলুবীজ তৈরি করা হয়। চলতি মৌসুমেও ২৫ লাখ প্লান্টলেট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। ১৯৫৭-৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই খামারে দীর্ঘকাল সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ চললেও ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে আলুবীজ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এর কার্যক্রমে আমূল পরিবর্তন আসে। বর্তমানে ডোমার খামারের নিজস্ব আয়তন ৫১৪.৪৮ একর এবং পার্শ্ববর্তী দেবীগঞ্জে আরও ৮৬.২৯ একর জমিতে বীজ উৎপাদন কার্যক্রম বিস্তৃত। খামারের প্রতি ইঞ্চি জমিকে চাষাবাদের আওতায় এনে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় অনন্য অবদান রাখা হচ্ছে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার এই খামারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পটেটো প্লান্টার দিয়ে বীজ রোপণ, ডিগার দিয়ে আলু উত্তোলন এবং গ্রেডার মেশিনের মাধ্যমে বীজ আলু বাছাই করা হয়। উৎপাদিত এই বিশাল পরিমাণ বীজ সংরক্ষণের জন্য নিজস্ব হিমাগারের পাশাপাশি সারাদেশে বিএডিসির ৩২টি হিমাগার

 

জোন ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন মানসম্মত আলুবীজ দেশের প্রান্তিক কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

চলতি মৌসুমে খামারটিতে মোট ১৮টি উন্নত জাতের আলু চাষ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছেড় বিএডিসি আলু-১ (সানসাইন), আলু-৩ (সানতানা), আলু-৬ (কুমবিকা), আলু-৭ (কুইন অ্যানি), আলু-৮ (লেবেলা), বারিআলু-৭ (ডায়মন্ট), বারিআলু-৮ (কার্ডিনাল), বারিআলু-১৩ (গ্রানোলা), বারিআলু-২৫ (এস্টারিক্স), বারিআলু-২৯ (কারেজ),

 

বারিআলু-২৮ (লেডিরোসেটা), বারিআলু-৫৪ (মিউজিকা), বারিআলু-৮৫ (৭ ফোর ৭), বারিআলু-৯০ (এলোয়েট), সাগিত, বারিআলু-৬২ ও বারিআলু-৮৬। খামারটির উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও ল্যাব আধুনিকীকরণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপপরিচালক মো. আবু তালেব মিঞা। তাঁর অধীনে খামারের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, “ডোমার ভিত্তি আলুবীজ উৎপাদন খামার দেশের আলুবীজ উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি চালানো হয় যাতে কৃষকরা শতভাগ ভাইরাসমুক্ত বীজ পায়। দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় আমরা যে ভূমিকা রাখছি, এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।” খামারের ডিএডি রতন কুমার রায় জানান, মাঠপর্যায়ে বর্তমানে রোপণ ও হার্ডেনিং কার্যক্রম দ্রুতগতিতে চলছে এবং শীঘ্রই হারভেস্ট (আলু উত্তোলন) শুরু হবে।

 

উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে ডোমার খামার বাংলাদেশের আলু উৎপাদনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষিকে এগিয়ে নিতে এই খামারটির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।