যশোরের ঝিকরগাছায় নেশাগ্রস্থ স্বামীর পরকীয়ার বলি হলেন গৃহবধু রিমু (২০)। নেশার টাকার জন্য সে তার স্ত্রী সাবিয়া ইয়াসমিন রিমু (২০) কে মারপিট করে ও গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলেও প্রধান অভিযুক্ত শিহাব শাহরিয়ার রিয়াদকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর থেকে রিয়াদসহ তার পরিবারের বাকি সদস্যরা পলাতক রয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে যশোরের ঝিকরগাছা থানার হাজিরবাগ ইউনিয়নের রায়পটন গ্রামে। নিহত সাবিয়া ইয়াসমিন রিমু একই ইউনিয়নের খোশালনগর গ্রামের শফিকুল ইসলামের কন্যা।
স্থানীয় ও নিহতের পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পারিবারিক ভারে রিমু ও রিয়াদের বিবাহ হয়। বিয়ের কিছু দিন পরেই স্ত্রী রিমু জানতে পারেন তার স্বামী রিয়াদ নেশা গ্রস্থ এবং পরকীয়া প্রেমে আসক্ত। পরে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন রিয়াদ তার প্রবাসী চাচা শফিকুল ইসলামের স্ত্রী আসমাউল হুসনা কিয়ার সাথে পরকীয়া প্রেমে আসক্ত। সে ও তার চাচী প্রায় রাতেই এক সাথে বসে নেশা করতো এবং আপত্তিকর কর্মকান্ড করতো। স্ত্রী রিমু এই সব অনৈতিক কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করায় তার ওপর চালানো হতো শারিরিক ও মানষিক নির্যাতন। যা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বার কয়েক শালিস বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোন উন্নতি না হওয়ায় গত মার্চ মাসের শেষের দিকে রিমু তার পিতার বাড়িতে চলে আসেন এবং নেশাগ্রস্থ পরকীয়া প্রেমে আসক্ত রিয়াদের সাথে সংসার করবেন না মর্মে তার পিতা-মাতাকে জানিয়ে দেন। কিন্তু গত ঈদুল আযহার তিন দিন আগে দুই পরিবারের মুরব্বীরা বসে একটা আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে রিয়াদ অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করে স্ত্রীকে নিজের বাড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু কথায় আছে চোরাই না শোনে ধর্মের কাহিনী। নিজ স্ত্রীকে ঘরে রেখে সে রাত কাটাতো প্রবাসী চাচার স্ত্রী আসমাউল হুসনা কিয়ার ঘরে। যা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ফের ঝগড়া বিবাদ শুরু হয়। তারই জের ধরে গত ৩ জুন সকালে প্রেমিকা চাচী কিয়ার প্ররোচনায় নিজ ঘরে ফেলে স্ত্রী রিমু কে সাইকেলের চেইন দিয়ে ও ঘরের ডাসা দিয়ে বেধড়ক মারপিট করে গুরুতর জখম করে নেশাগ্রস্থ রিয়াদ। মারধরের এক পর্যায়ে স্ত্রী রিমু অচেতন হয়ে পড়লে তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে স্বামী রিয়াদ ও তার প্রেমিকা চাচী কিয়া । এই অবস্থায় সকাল ১০টার দিকে রিমু শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নেশাখোর স্বামী রিয়াদ, তার প্রেমিকা চাচী আসমাউল হুসনা কিয়া, রিয়াদের মা রেহেনা সুলতানাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে রিমুকে তার ঘরের সিলিং ফ্যানের একটি পাকার সাথে ঝুলিয়ে দেওয়া চেষ্টা করে। কিন্তু ৭০ কেজি ওজনের রিমুকে তারা মাটি থেকে তুলতে না পেরে তাকে মাটিতে শুইয়ে রেখে বিছানার চাদর দিয়ে ঢেকে রেখে তার স্বজনদের খবর দেয়। পরে স্বজনরা রিয়াদের বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান তার একমাত্র কন্যা রিমুর লাশ মেঝেতে শুয়ানো আছে। পরে নিহতের স্বজনরা লাশের শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্নক জখমের চিহ্ন দেখে প্রতিবাদ করলে নিহতের স্বামী রিয়াদ, রিয়াদের প্রেমিকা চাচী আসমাউল হুসনা কিয়া, রিয়াদের মা রেহেনা সুলতানা এবং রিয়াদের পিতা শহিদুল ইসলাম দ্রুত পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে ঝিকরগাছা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে লাশের সুরোতহাল রিপোর্ট করে ময়না তদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। পোষ্ট মের্টম শেষে পুলিশ স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করলে তারা পারিবারিক কবরস্থানে নিহত রিমুকে দাফন করেন। এদিকে এই ঘটনায় ঝিকরগাছা থানায় মামলা হলেও পুলিশ এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি। এদিকে কন্যা হত্যার বিচার দাবি করে গত ৮ জুন নিহত রিমুর পিতা শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ঝিকরগাছা আমলী আদালতে আরো একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় নিহত রিমুর স্বামী রিয়াদসহ ৪ জনকে আসামী করা হয়েছে। মামলার অপর আসামীরা হলেন রিয়াদের মা রেহেনা সুলতানা, তার পিতা শহিদুল ইসলাম এবং প্রেমিকা চাচী আসমাউল হুসনা কিয়া।
এদিকে সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে গতকাল সকালে নিহত রিমুর পিতা শফিকুল ইসলাম ও মা নার্গিস খাতুন যশোর প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সম্মেলনের মাধ্যমে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে দুই হাত জোড় করে তারা সত্য ঘটনাটি তুলে ধরার দাবি জানান। এসময় সন্তান হারা জনক-জননীর ক্রোন্দনে এবং আহাকারে প্রেস ক্লাবের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। সাংবাদিক সম্মেলনে নিহতের অন্যান্য স্বজন এবং এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।