সুন্দরবনে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারানো সুব্রতের স্ত্রী চান না তার সন্তান বাপ-দাদার পেশায় আসুক
- Update Time : ০৩:৫৫:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
- / ১১১ Time View

খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে ফেরার পথে করমজল খালে কুমিরের আক্রমণে মৃত্যু সুব্রত মণ্ডলের স্ত্রী মুন্নী খাঁ (মুন) একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। নবজাতককে নিয়ে ২৫ বছর বয়সী মুন্নী নিজের নানি অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়িতেই আছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে নানির বাড়িতেই থাকছেন তিনি।
মুঠোফোনে মুন জানান, সুব্রত মণ্ডল (৩২) খুলনার দাকোপ উপজেলার পূর্ব ঢাংমারী এলাকার কুমুদ মণ্ডলের ছেলে। মুনের নানিবাড়িও একই এলাকায়। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর দিন সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন সুব্রত। ঘরে তখন টাকার টানাটানি, মুন অসুস্থ, তবু কাঁকড়া ধরতে বনে যেতেই হয়েছিল তাকে।
সেদিনও অন্য দিনের মতো সঙ্গীদের নিয়ে বনে গিয়েছিলেন সুব্রত। সুব্রতদের বাড়ি থেকে সুন্দরবনের করমজল খালের দূরত্ব খুব বেশি নয়, দুই কিলোমিটারের মতো। ফেরার পথে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় কুমির আক্রমণ করে তাকে। প্রায় সাত ঘণ্টা পর করমজল খালের গজালমারী এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মুন বলেন, স্বামীর মৃত্যুর সময় তিনি প্রায় চার মাসের অন্তঃসত্তা¡ ছিলেন। ঈদের আগের দিন ২০ মার্চ শুক্রবার দুপুরে প্রসবব্যথা উঠলে প্রথমে তাকে মোংলায় ও পরে চিকিৎসকের পরামর্শে খুলনায় নেওয়া হয়। সেখানে দিবাগত রাতে তিনি একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। ২৩ মার্চ ছেলেকে নিয়ে নানি অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়িতেই ফিরেছেন। তিনি এবং নবজাতক দুজনেই সুস্থ আছেন।
অনেকটা কান্না জড়িত কন্ঠে মুন বলেন, সাত বছরের অপেক্ষার পর ঘরে সন্তান এল। কিন্তু বাবা হওয়ার আনন্দের এই সংবাদ যার সবচেয়ে আগে শোনার কথা, তিনি তখন আর নেই। আমার ছেলেটাও ওর বাবার মুখটা দেখতে পেল না। তবে আমার শাশুড়ি বামনী মণ্ডল এসে সন্তানকে দেখে গেছেন।
মুন বলেন, ভালোবেসেই বিয়ে হয়েছিল তাদের। দুজনের দুই ধর্মের পরিবার হওয়ায় প্রথম দিকে এই বিয়ে সহজে মেনে নেয়নি কেউ। দুই বছরের বেশি সময় শ্বশুরবাড়িতে স্বাভাবিক পরিবেশ পাননি মুন। পরে ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু বিধি বাম; সংসার স্বাভাবিক হওয়ার পর কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান সুব্রত। তবে সুব্রতের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে ওর বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রেখেছি শুভজিৎ।
মুন আরও বলেন, তার পুরো জীবনটাই কষ্টের। তার যখন আট মাস বয়স, তখন তার বাবা তাকে ও তার মাকে রেখে চলে যান। পরে তার বাবার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর তার মা আবার বিয়ে করেন। তিনি বড় হন নানির কাছে। তার নানি অপর্ণা পাটোয়ারী একটি চায়ের দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালান। তার সামনে এখন বড় চিন্তা-স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় এক লাখ টাকার ঋণ, আর ছেলের ভবিষ্যৎ।
মুন বলেন, আমার শ্বশুরও ছোটবেলা থেকেই ’জঙ্গল’ করতেন। তিনি বয়োবৃদ্ধ হওয়ার পর আমার স্বামী ’জঙ্গলে’ যেতেন। সুব্রতের ছোট অন্য তিন ভাইয়ের একজন বিদেশে গেলেও অন্য আর দুই জন ’জঙ্গল’ করেন। ’জঙ্গল’ সব সময়ই বিপদসংকুল। আমি চাই আমার সন্তান বাদাবনে না যাক; লেখাপড়া শিখুক। বাপ-দাদার পেশায় না আসুক।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ-কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্ত্রী’রা সুন্দরবন-লাগোয়া জনপদের অসংখ্য গ্রামে অপয়া, অলক্ষ্মী অপবাদ নিয়ে সমাজে চরম অবহেলিত জীবন যাপন করছেন। নিদারুণ কষ্টে চলছে তাদের পরিবার।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুব্রত মণ্ডল সুন্দরবনে বৈধভাবে কাঁকড়া আহরণ করতে গিয়েছিলেন। তার পরিবারকে সরকারি সহায়তার তিন লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে। তবে বৈধ পাস পারমিট (অনুমতি) ছাড়া কেউ সুন্দরবনে প্রবেশ করে দুর্ঘটনায় পড়লে পরিবার ওই সহায়তা পাবে না।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। ১৩টি বড় নদীসহ ৪৫০টির মতো খাল রয়েছে সুন্দরবনে। সুন্দরবনের আয়তনের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন অভয়ারণ্য। এসব এলাকায় জেলেদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সুন্দরবন-লাগোয়া গ্রামগুলোর পুরুষরা বংশপরম্পরা সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু আহরণের কাজ করেন। আর নারী ও শিশুরা ব্যস্ত থাকেন কাঠ সংগ্রহ ও চিংড়ির পোনা ধরার কাজে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই কাজ আঁকড়ে ধরে আছেন। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনপ্রবাহের সাথে সুন্দরবন আবতিত আবহমান কাল থেকে। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা সংকট আর ঝুঁকি বনজীবীদের জীবন ও জীবিকার ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল একাধিক পেশাজীবী জানান, সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে বর্তমানে মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বনের মধ্যে মৌচাকের দেখা মিলছে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কম। আর সাম্প্রতিক সময়ে বনে প্রবেশ, গোলপাতা আহরণ ও নদী-খালে মাছ-কাঁকড়া ধরতে বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের উৎকোচ বাণিজ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। সাথে রয়েছে বনদস্যু ও বাঘ-কুমিরের ঝুঁকি। এসব কারণে কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যাচ্ছেন।

















