ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের সহযোগিতায় চিকিৎসা শেষে নিজ বাড়িতে ফিরলেন তিনি
- Update Time : ০৫:৩৯:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
- / ৭৩ Time View

লাল বানুর স্বামী চান মিয়া। তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার চন্ডিখলা এলাকায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী চান মিয়া ও ছেলে বাচ্চু মিয়া।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে লাল বানুসহ তার পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সর্বশেষ বাড়ি ফেরার আগে তার প্রয়োজনীয় ওষুধ ও যাতায়াতের খরচও সংগঠনটির পক্ষ থেকে বহন করা হয়। এর আগে গত ৩ আগস্ট সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে লাল বানুর দ্বিতীয় দফা পায়ের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। এর আগে দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে ভর্তি হলে তার প্রথম অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। দুই দফা অস্ত্রোপচারসহ দীর্ঘ সময় হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
জানা যায়, গত ২ জুলাই ময়মনসিংহে নিজ বাড়িতে ফেরার উদ্দেশ্যে বের হন লাল বানু। পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাউতলী ব্রিজের ওপর সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। এতে তার বাম পা ও বাম হাতে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে স্থানীয় কয়েকজন তাকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে ভর্তি করেন। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তার চিকিৎসা শুরু হয়। হাসপাতাল থেকে ওষুধ ও খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হলেও চিকিৎসার জন্য বাইরে থেকে বেশ কিছু জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে হয়। এ সময় থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর লাল বানুর চিকিৎসার যাবতীয় প্রয়োজনীয় খরচ বহনের পাশাপাশি নিয়মিত খাবার, ফল, শুকনো খাবার, ওষুধসহ বিভিন্ন সহযোগিতা করে আসছিল। অস্ত্রোপচারের জন্য এ পর্যন্ত মোট চার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। প্রথম অস্ত্রোপচারে তিন ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের আগে গত রোববার রাতে আরও এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হলে লাল বানুর ছেলে বাচ্চু মিয়া দীর্ঘ সময় বিভিন্ন স্থানে ঘুরেও রক্তের ব্যবস্থা করতে পারেননি। পরে শহরের কালাইশ্রীপাড়ার একটি ব্লাড ব্যাংক থেকে ২ হাজার টাকায় রক্ত কেনার সিদ্ধান্ত নিলেও সেই অর্থও জোগাড় করতে পারেননি বাচ্চু মিয়া। বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মাধ্যমে এক ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করা হয়। এর যাবতীয় খরচও সংগঠনটির পক্ষ থেকে বহন করা হয়। একই সঙ্গে ওই রাতে লাল বানু ও তার স্বজনদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়।
লাল বানুর পরিবারের সদস্যরা জানান, গত কোরবানির ঈদের পর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার নাতিদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। তার দুই নাতি শামিম ও আজিজুল গত প্রায় ১০ বছর ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার রামরাইল ইউনিয়নের বিজেশ্বর গ্রামের মুন্সি বাড়ি মোড়ে রনির বাড়িতে বিনা ভাড়ায় বসবাস করছেন। সেখান থেকে ময়মনসিংহে ফেরার পথেই দুর্ঘটনার শিকার হন লাল বানু।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের নার্সিং ইনচার্জ তাহমিনা আক্তারসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দীর্ঘ সময় ধরে তার চিকিৎসা কার্যক্রম চলে। পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর তার চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, খাবার, ওষুধ, রক্ত এবং অন্যান্য খরচ বহন করে পাশে ছিল।
অর্থোপেডিক্স বিভাগের নার্সিং ইনচার্জ তাহমিনা আক্তার বলেন, লাল বানু দীর্ঘদিন আমাদের বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসক ও নার্সদের সর্বোচ্চ সহযোগিতায় তার দুই দফা অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে তিনি অনেকটাই সুস্থ। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারায় আমরা আনন্দিত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জি. মো. আজহার উদ্দিন বলেন, লাল বানু দুর্ঘটনার পর অসহায় অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় চিকিৎসার বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে আমরা পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। রক্তের প্রয়োজন হলে রক্তের ব্যবস্থা, ওষুধ, খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছেন, এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ। মানুষের বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোই ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মূল উদ্দেশ্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের অজ্ঞাত ও অসহায় রোগীদের নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতা করে আসছে। বিশেষ করে যেসব রোগীর পাশে পরিবারের কেউ নেই কিংবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল, তাদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সহযোগিতায় সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জেলার অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ লাশ দাফনের ক্ষেত্রেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের ভূমিকা নজিরবিহীন। এ ধরনের মানবিক কাজ কোনো সংগঠন নিয়মিতভাবে করছে, এমন নজির আমার জানা নেই। লাল বানুর মতো অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরকে সাধুবাদ জানাই।
দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় হাসপাতালের চিকিৎসা, দুই দফা অস্ত্রোপচার এবং নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে স্বজনদের সঙ্গে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন লাল বানু। তার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরায় স্বস্তি ফিরেছে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে।




















