১১:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‎সুন্দরবন ধ্বংসের দায় ও বার্কলেস ব্যাংক: যুক্তরাজ্যের আদালতে ঐতিহাসিক অভিযোগ ও আইনি লড়াই ‎

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট
  • Update Time : ০৭:২৮:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ৬৩ Time View

 

‎সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিতর্কিত আর্থিক সহায়তার অভিযোগে ব্রিটিশ বহুজাতিক বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য সরকারের দপ্তরে মামলা দায়ের করেছেন বাংলাদেশ ও ভারতের পরিবেশকর্মীরা।..

‎

‎বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের তিন অভিযোগকারী যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্টের কাছে এই অভিযোগ জমা দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন খাতে এক নতুন আইনি নজির স্থাপন করেছে। অভিযোগকারীদের মূল দাবি হলো, বার্কলেস ব্যাংক এমন কিছু প্রকল্পের সঙ্গে আর্থিক সংযোগ বজায় রেখেছে যা আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও মানবাধিকার নীতিমালা সরাসরি লঙ্ঘন করে। বিশেষ করে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও বন্ডের আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে ব্যাংকটি সুন্দরবনের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। কিংস কলেজ লন্ডনের কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের সহায়তায় দায়ের করা এই অভিযোগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতের এনটিপিসি লিমিটেড এবং এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যুতে বার্কলেস ব্যাংকের সম্পৃক্ততা ছিল, যা প্রকারান্তরে বিতর্কিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক ভিত্তি মজবুত করেছে।

‎

‎ভুক্তভোগী ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান পশুর নদীর তীরে হওয়ায় এটি সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পরিবেশকর্মী শরীফ জামিলসহ অন্য অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন যে, প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে পশুর নদীর পানিতে পারদ ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুর মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বনের জলজ ও স্থলজ প্রাণীর জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, বার্কলেস ব্যাংক বিনিয়োগের আগে পরিবেশগত প্রভাব বা মানবাধিকার ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন করেনি, যা একটি দায়িত্বশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কাম্য ছিল না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যজীবীরাও এই অভিযোগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তা আজ এই কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের কারণে অনিশ্চিত। তাদের ভাষ্যমতে, যখন বিশ্বের অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে রামপাল প্রকল্প থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে, তখন বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানের এমন অর্থায়ন কেবল অনৈতিকই নয়, বরং পরিবেশগত অপরাধের শামিল।

‎

‎অভিযোগের বিপরীতে বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ব্রিটিশ আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউনেসকোর পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করা ব্যাংকিং খাতের নৈতিকতার পরিপন্থী। ইউনেসকো ২০১৬ সালেই তাদের প্রতিবেদনে বায়ু ও পানিদূষণের কারণে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকাটি অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকির কথা জানিয়েছিল, যা বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানের অজানা থাকার কথা নয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর অভিযোগটি তদন্তের জন্য গ্রহণ করবে কি না, তা মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। পরিবেশবাদী আইনজীবীদের দাবি, এই তদন্তের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দায়বদ্ধতা তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়নের আগে তারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে। তারা আরও মনে করেন, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বাংলাদেশের বিশাল সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোই হবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের একমাত্র পথ।

‎

‎পরিশেষে, বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার লড়াইয়ে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সুন্দরবনের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে রক্ষা করার জন্য কেবল স্থানীয় আন্দোলনই যথেষ্ট নয়, বরং এর পেছনে থাকা আর্থিক মদদদাতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। এই মামলার রায় বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে। যদি ব্যাংকগুলো পরিবেশের মূল্যের চেয়ে মুনাফাকে বড় করে দেখে, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সুন্দরবনের মতো এলাকাগুলোর ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত গোটা অঞ্চলের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে।

‎

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

‎সুন্দরবন ধ্বংসের দায় ও বার্কলেস ব্যাংক: যুক্তরাজ্যের আদালতে ঐতিহাসিক অভিযোগ ও আইনি লড়াই ‎

Update Time : ০৭:২৮:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

‎সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিতর্কিত আর্থিক সহায়তার অভিযোগে ব্রিটিশ বহুজাতিক বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য সরকারের দপ্তরে মামলা দায়ের করেছেন বাংলাদেশ ও ভারতের পরিবেশকর্মীরা।..

‎

‎বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের তিন অভিযোগকারী যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্টের কাছে এই অভিযোগ জমা দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন খাতে এক নতুন আইনি নজির স্থাপন করেছে। অভিযোগকারীদের মূল দাবি হলো, বার্কলেস ব্যাংক এমন কিছু প্রকল্পের সঙ্গে আর্থিক সংযোগ বজায় রেখেছে যা আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও মানবাধিকার নীতিমালা সরাসরি লঙ্ঘন করে। বিশেষ করে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও বন্ডের আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে ব্যাংকটি সুন্দরবনের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। কিংস কলেজ লন্ডনের কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের সহায়তায় দায়ের করা এই অভিযোগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতের এনটিপিসি লিমিটেড এবং এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যুতে বার্কলেস ব্যাংকের সম্পৃক্ততা ছিল, যা প্রকারান্তরে বিতর্কিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক ভিত্তি মজবুত করেছে।

‎

‎ভুক্তভোগী ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান পশুর নদীর তীরে হওয়ায় এটি সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পরিবেশকর্মী শরীফ জামিলসহ অন্য অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন যে, প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে পশুর নদীর পানিতে পারদ ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুর মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বনের জলজ ও স্থলজ প্রাণীর জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, বার্কলেস ব্যাংক বিনিয়োগের আগে পরিবেশগত প্রভাব বা মানবাধিকার ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন করেনি, যা একটি দায়িত্বশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কাম্য ছিল না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যজীবীরাও এই অভিযোগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তা আজ এই কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের কারণে অনিশ্চিত। তাদের ভাষ্যমতে, যখন বিশ্বের অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে রামপাল প্রকল্প থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে, তখন বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানের এমন অর্থায়ন কেবল অনৈতিকই নয়, বরং পরিবেশগত অপরাধের শামিল।

‎

‎অভিযোগের বিপরীতে বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ব্রিটিশ আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউনেসকোর পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করা ব্যাংকিং খাতের নৈতিকতার পরিপন্থী। ইউনেসকো ২০১৬ সালেই তাদের প্রতিবেদনে বায়ু ও পানিদূষণের কারণে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকাটি অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকির কথা জানিয়েছিল, যা বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানের অজানা থাকার কথা নয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর অভিযোগটি তদন্তের জন্য গ্রহণ করবে কি না, তা মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। পরিবেশবাদী আইনজীবীদের দাবি, এই তদন্তের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দায়বদ্ধতা তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়নের আগে তারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে। তারা আরও মনে করেন, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বাংলাদেশের বিশাল সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোই হবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের একমাত্র পথ।

‎

‎পরিশেষে, বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার লড়াইয়ে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সুন্দরবনের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে রক্ষা করার জন্য কেবল স্থানীয় আন্দোলনই যথেষ্ট নয়, বরং এর পেছনে থাকা আর্থিক মদদদাতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। এই মামলার রায় বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে। যদি ব্যাংকগুলো পরিবেশের মূল্যের চেয়ে মুনাফাকে বড় করে দেখে, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সুন্দরবনের মতো এলাকাগুলোর ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত গোটা অঞ্চলের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে।

‎