০৯:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‎সাগর উত্তাল: ইলিশের ভরা মৌসুমে অনিশ্চয়তায় উপকূলের হাজারো জেলে ‎

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট
  • Update Time : ০৮:১৩:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
  • / ১৩৪ Time View

 

‎বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে নামা কয়েক হাজার জেলে ট্রলার নিয়ে উপকূলে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এতে মৌসুমের শুরুতেই ইলিশ আহরণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জেলে ও মালিকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

‎

‎বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ইলিশ আহরণে যাওয়া কয়েক হাজার জেলে তাদের ট্রলার নিয়ে উপকূলের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে জেলেরা যখন সমুদ্রে ইলিশ শিকারে নেমেছিলেন, ঠিক তখনই প্রবল পূবালী বাতাস ও উত্তাল ঢেউ তাদের পরিকল্পনায় ছন্দপতন ঘটায়। বর্তমানে সুন্দরবন সংলগ্ন মেহেরআলী, আলোরকোল ও ভেদাখালীসহ উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন নদ-নদীতে শত শত ফিশিং ট্রলার নোঙর করে আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তার প্রেক্ষিতে সাগরে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ায় জেলেরা জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের পথ বেছে নিয়েছেন, যা ভরা মৌসুমে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

‎

‎ভুক্তভোগী জেলে ও ট্রলার মালিকদের ভাষ্যমতে, সাগরের বর্তমান পরিস্থিতি মাছ ধরার অনুকূলে নেই। দীর্ঘ বিরতির পর ঋণ করে ও মহাজনের দাদন নিয়ে সাগরে পাড়ি জমানোর পর এই আকস্মিক দুর্যোগ তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। বাগেরহাটের বগা এলাকার ফিশিং বোট মাঝি নজরুল ইসলাম জানান, গত দুই দিন ধরে সাগরে যে মাত্রার ঢেউ ও বাতাস অনুভূত হচ্ছে, তাতে ট্রলার স্থির রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রায়েন্দা, মহিপুর, খেপুপাড়া ও পাথরঘাটার বিভিন্ন খালে বর্তমানে জেলেরা অলস সময় পার করছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মাছ ধরতে না পারায় অধিকাংশ জেলের ট্রলারের জ্বালানি ও রসদ খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য এক চরম বাস্তব সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।

‎

‎সংশ্লিষ্ট ট্রলার মালিক সমিতি ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাগরের এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মৎস্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। শরণখোলা উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন জানান, জেলেরা অনেক আশা নিয়ে সমুদ্রে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু দুর্যোগের কবলে পড়ায় এখন তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। একই সুর শোনা গেছে বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর কণ্ঠে, যিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রলার পুনরায় সাগরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলেদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও, ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য কোনো বিশেষ প্রণোদনা বা সহায়তার ঘোষণা এখনো আসেনি।

‎

‎এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু জেলেদের আয়ের ওপর পড়ছে না, বরং দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও দামের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভরা মৌসুমে ইলিশের এই সংকট কাটাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত আবহাওয়া বুলেটিন প্রচারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাগরের এই অনিশ্চয়তা সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ শিল্পকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যার সমাধানে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং জেলেদের জন্য উন্নত সতর্কবার্তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

‎সাগর উত্তাল: ইলিশের ভরা মৌসুমে অনিশ্চয়তায় উপকূলের হাজারো জেলে ‎

Update Time : ০৮:১৩:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

 

‎বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে নামা কয়েক হাজার জেলে ট্রলার নিয়ে উপকূলে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এতে মৌসুমের শুরুতেই ইলিশ আহরণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জেলে ও মালিকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

‎

‎বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ইলিশ আহরণে যাওয়া কয়েক হাজার জেলে তাদের ট্রলার নিয়ে উপকূলের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে জেলেরা যখন সমুদ্রে ইলিশ শিকারে নেমেছিলেন, ঠিক তখনই প্রবল পূবালী বাতাস ও উত্তাল ঢেউ তাদের পরিকল্পনায় ছন্দপতন ঘটায়। বর্তমানে সুন্দরবন সংলগ্ন মেহেরআলী, আলোরকোল ও ভেদাখালীসহ উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন নদ-নদীতে শত শত ফিশিং ট্রলার নোঙর করে আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তার প্রেক্ষিতে সাগরে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ায় জেলেরা জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের পথ বেছে নিয়েছেন, যা ভরা মৌসুমে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

‎

‎ভুক্তভোগী জেলে ও ট্রলার মালিকদের ভাষ্যমতে, সাগরের বর্তমান পরিস্থিতি মাছ ধরার অনুকূলে নেই। দীর্ঘ বিরতির পর ঋণ করে ও মহাজনের দাদন নিয়ে সাগরে পাড়ি জমানোর পর এই আকস্মিক দুর্যোগ তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। বাগেরহাটের বগা এলাকার ফিশিং বোট মাঝি নজরুল ইসলাম জানান, গত দুই দিন ধরে সাগরে যে মাত্রার ঢেউ ও বাতাস অনুভূত হচ্ছে, তাতে ট্রলার স্থির রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রায়েন্দা, মহিপুর, খেপুপাড়া ও পাথরঘাটার বিভিন্ন খালে বর্তমানে জেলেরা অলস সময় পার করছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মাছ ধরতে না পারায় অধিকাংশ জেলের ট্রলারের জ্বালানি ও রসদ খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য এক চরম বাস্তব সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।

‎

‎সংশ্লিষ্ট ট্রলার মালিক সমিতি ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাগরের এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মৎস্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। শরণখোলা উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন জানান, জেলেরা অনেক আশা নিয়ে সমুদ্রে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু দুর্যোগের কবলে পড়ায় এখন তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। একই সুর শোনা গেছে বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর কণ্ঠে, যিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রলার পুনরায় সাগরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলেদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও, ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য কোনো বিশেষ প্রণোদনা বা সহায়তার ঘোষণা এখনো আসেনি।

‎

‎এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু জেলেদের আয়ের ওপর পড়ছে না, বরং দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও দামের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভরা মৌসুমে ইলিশের এই সংকট কাটাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত আবহাওয়া বুলেটিন প্রচারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাগরের এই অনিশ্চয়তা সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ শিল্পকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যার সমাধানে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং জেলেদের জন্য উন্নত সতর্কবার্তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা।