১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‎বাগেরহাটের দিঘি থেকে কক্সবাজারের সাফারি পার্কে: অনশনের পর নতুন ঠিকানায় ধলাপাহাড়

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট
  • Update Time : ০৭:২৫:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৬০ Time View

 

‎বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধার করা আলোচিত কুমির ধলাপাহাড় এখন কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে। দীর্ঘ দুই মাস ৯ দিন খাবার না খাওয়ার পর নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

‎

‎বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করা আলোচিত কুমির ধলাপাহাড়কে গত ১২ আগস্ট বন অধিদপ্তরের বিশেষ অনুমোদনে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সাত থেকে আট ফুট দৈর্ঘ্যের এবং ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি ওজনের এই কুমিরটি গত ৩ জুন মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনা হয়েছিল। উদ্ধার পরবর্তী দুই মাস ৯ দিন সময়কালে কুমিরটি কোনো প্রকার খাবার গ্রহণ করেনি, যা বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পালের ভাষ্যমতে, শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী হিসেবে কুমিরের শক্তি সঞ্চয়ের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এবং দীর্ঘ সময় খাবার গ্রহণ না করেও এটি শারীরিকভবে সুস্থ ছিল। মূলত পরিচিত পরিবেশ পরিবর্তন এবং বন্দিদশার চাপের কারণেই প্রাণীটি স্বাভাবিক আচরণ থেকে বিরত ছিল বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট বনকর্মীরা।

‎

‎ধলাপাহাড়ের এই দীর্ঘ অনশন এবং স্থানান্তরের নেপথ্যে রয়েছে জননিরাপত্তার বিষয়টি। গত ১ জুন মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নামলে আট বছর বয়সী এক শিশুকে আক্রমণ করে হত্যা করে কুমিরটি। এর আগে একটি কুকুরকেও আক্রমণ করে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করে। স্থানীয়দের ক্রমাগত দাবির মুখে এবং নিরাপত্তার স্বার্থেই বন বিভাগ কুমিরটিকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্ধার পরবর্তী সময়ে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ডা. জুলকারনাইন কুমিরটির শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এর স্বাস্থ্যের কোনো অবনতি লক্ষ্য করেননি। কুমিরের শারীরিক বিপাক প্রক্রিয়া এবং শরীরে সঞ্চিত চর্বি থেকে শক্তি সংগ্রহের সক্ষমতা থাকায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে বেঁচে থাকা অস্বাভাবিক নয়, তবে নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে প্রাণীটির স্বভাবগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা জরুরি ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

‎

‎কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে পৌঁছানোর পর থেকে কুমিরটির অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলমের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পরিবেশে আসার পরবর্তী দিনই কুমিরটি একটি জীবিত মুরগি খেয়ে তার স্বাভাবিক ক্ষুধা ও আচরণের জানান দিয়েছে। সাফারি পার্কের নিয়মানুযায়ী সেখানে সপ্তাহে একদিন খাদ্য সরবরাহ করা হয়, যা কুমিরটির নতুন জীবনের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০০৫ সালে ভারত থেকে আনা কুমিরগুলোর মধ্যে ধলাপাহাড়ই একমাত্র জীবিত সদস্য, তাই এর সুরক্ষায় সাফারি পার্কের পক্ষ থেকে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। পরিবেশগত পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে কুমিরটির আচরণে যে পরিবর্তন আসার কথা ছিল, তা এখন পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা প্রাণীটির দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে আশার আলো দেখাচ্ছে।

‎

‎ধলাপাহাড়ের এই স্থানান্তর কেবল একটি কুমিরের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা নয়, বরং জনবসতির সাথে বন্যপ্রাণীর সংঘাত নিরসনে প্রশাসনের একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাজারের দিঘির মতো জনবহুল এলাকায় এমন আক্রমণাত্মক প্রাণীর উপস্থিতি যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা ধলাপাহাড়ের ঘটনার মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাফারি পার্কে কুমিরটির স্বাভাবিক আচরণ ফিরে পাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা প্রমাণ করে যে, বন্যপ্রাণীর জন্য সঠিক পরিবেশ নির্বাচন তাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে বন বিভাগের এই তদারকি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মডেলটি অন্যান্য অঞ্চলের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

‎

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

‎বাগেরহাটের দিঘি থেকে কক্সবাজারের সাফারি পার্কে: অনশনের পর নতুন ঠিকানায় ধলাপাহাড়

Update Time : ০৭:২৫:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

 

‎বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধার করা আলোচিত কুমির ধলাপাহাড় এখন কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে। দীর্ঘ দুই মাস ৯ দিন খাবার না খাওয়ার পর নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

‎

‎বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করা আলোচিত কুমির ধলাপাহাড়কে গত ১২ আগস্ট বন অধিদপ্তরের বিশেষ অনুমোদনে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সাত থেকে আট ফুট দৈর্ঘ্যের এবং ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি ওজনের এই কুমিরটি গত ৩ জুন মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনা হয়েছিল। উদ্ধার পরবর্তী দুই মাস ৯ দিন সময়কালে কুমিরটি কোনো প্রকার খাবার গ্রহণ করেনি, যা বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পালের ভাষ্যমতে, শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী হিসেবে কুমিরের শক্তি সঞ্চয়ের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এবং দীর্ঘ সময় খাবার গ্রহণ না করেও এটি শারীরিকভবে সুস্থ ছিল। মূলত পরিচিত পরিবেশ পরিবর্তন এবং বন্দিদশার চাপের কারণেই প্রাণীটি স্বাভাবিক আচরণ থেকে বিরত ছিল বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট বনকর্মীরা।

‎

‎ধলাপাহাড়ের এই দীর্ঘ অনশন এবং স্থানান্তরের নেপথ্যে রয়েছে জননিরাপত্তার বিষয়টি। গত ১ জুন মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নামলে আট বছর বয়সী এক শিশুকে আক্রমণ করে হত্যা করে কুমিরটি। এর আগে একটি কুকুরকেও আক্রমণ করে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করে। স্থানীয়দের ক্রমাগত দাবির মুখে এবং নিরাপত্তার স্বার্থেই বন বিভাগ কুমিরটিকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্ধার পরবর্তী সময়ে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ডা. জুলকারনাইন কুমিরটির শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এর স্বাস্থ্যের কোনো অবনতি লক্ষ্য করেননি। কুমিরের শারীরিক বিপাক প্রক্রিয়া এবং শরীরে সঞ্চিত চর্বি থেকে শক্তি সংগ্রহের সক্ষমতা থাকায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে বেঁচে থাকা অস্বাভাবিক নয়, তবে নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে প্রাণীটির স্বভাবগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা জরুরি ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

‎

‎কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে পৌঁছানোর পর থেকে কুমিরটির অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলমের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পরিবেশে আসার পরবর্তী দিনই কুমিরটি একটি জীবিত মুরগি খেয়ে তার স্বাভাবিক ক্ষুধা ও আচরণের জানান দিয়েছে। সাফারি পার্কের নিয়মানুযায়ী সেখানে সপ্তাহে একদিন খাদ্য সরবরাহ করা হয়, যা কুমিরটির নতুন জীবনের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০০৫ সালে ভারত থেকে আনা কুমিরগুলোর মধ্যে ধলাপাহাড়ই একমাত্র জীবিত সদস্য, তাই এর সুরক্ষায় সাফারি পার্কের পক্ষ থেকে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। পরিবেশগত পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে কুমিরটির আচরণে যে পরিবর্তন আসার কথা ছিল, তা এখন পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা প্রাণীটির দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে আশার আলো দেখাচ্ছে।

‎

‎ধলাপাহাড়ের এই স্থানান্তর কেবল একটি কুমিরের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা নয়, বরং জনবসতির সাথে বন্যপ্রাণীর সংঘাত নিরসনে প্রশাসনের একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাজারের দিঘির মতো জনবহুল এলাকায় এমন আক্রমণাত্মক প্রাণীর উপস্থিতি যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা ধলাপাহাড়ের ঘটনার মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাফারি পার্কে কুমিরটির স্বাভাবিক আচরণ ফিরে পাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা প্রমাণ করে যে, বন্যপ্রাণীর জন্য সঠিক পরিবেশ নির্বাচন তাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে বন বিভাগের এই তদারকি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মডেলটি অন্যান্য অঞ্চলের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

‎