১১:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টেকসই বেড়িবাঁধ ও পাকা রাস্তার প্রতীক্ষায় দাকোপ: সারা দেশ এগোলেও ভাগ্য বদলেনি উপকূলবাসীর

রিপোর্ট: সোহাগ সরদার, পর্ব-১
  • Update Time : ০২:০২:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
  • / ৮৩ Time View

দাকোপ থেকে ফিরে, সোহাগ সরদার এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: (পর্ব-১)

চারিদিকে নদীবেষ্টিত খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপ। ভদ্রা, চুনকুড়ি, পশুর, ঢাকী, মাংগা, ঢাংমারী, ঝপঝপিয়া আর প্রমত্তা শিবসার মতো ছোট-বড় এক ডজন নদী বুকে নিয়ে বেঁচে আছে এই অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু এই নদীগুলোই এখন স্থানীয়দের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ। একদিকে শিবসা ও পশুর নদীর ভয়ংকর ঢেউ ও তীব্র স্রোতে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে জনপদ, অন্যদিকে উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর বেহাল দশা উপকূলবাসীকে ঠেলে দিয়েছে চরম ভোগান্তিতে।

বছরের পর বছর পার হলেও ভাঙনকবলিত টেকসই বেড়িবাঁধ এবং গ্রামীণ রাস্তাঘাট পাকা করার দাবি আলোর মুখ দেখেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ— জনপ্রতিনিধি বদলায়, কিন্তু গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার ভাগ্য বদলায় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে দুর্ভোগের শেষ নেই যেখানে উপজেলার সদর থেকে শুরু করে প্রান্তিক ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ সড়কেই এখন কাদার রাজত্ব। সরেজমিনে দেখা গেছে: সুতারখালী ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি রাস্তা এখনো কাঁচা। সামান্য বৃষ্টিতেই এই সড়কগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।তিলডাঙ্গা ইউনিয়নে কামিনীবাসিয়া এলাকার রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় থেকে গেছে। ইউনিয়নের অনেক জায়গায় রাস্তা করার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে কাজ না করে ফেলে রাখা হয়েছে।

এদিকে পানখালী ও কামারখোলা এই দুই ইউনিয়নের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম সড়কগুলো এখনো মাটির রাস্তা। বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়াও বাজুয়া ইউনিয়নের ওয়াপদা রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। নদী ঘেঁষে থাকা এই রাস্তাটি যেকোনো সময় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এমনকি গ্রামের কথা বাদ দিলেও খোদ উপজেলা পরিষদ এবং চালনা পৌরসভার চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। উপজেলা পরিষদের ঠিক সামনের প্রধান সড়কটির বেহাল দশা প্রশাসনিক কাজে আসা সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে চালনা পৌরসভার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাওয়ার রাস্তাটিরও চরম জরাজীর্ণ অবস্থা, যা স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের যাতায়াতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়দের মতে নদীভাঙন ও সড়ক টেকসই না হওয়ার কারণ, নদী ঘেঁষে রাস্তা থাকায় এবং শক্তিশালী গাইড ওয়াল বা টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় বর্ষা ও জোয়ারের পানিতে কাঁচা রাস্তাগুলো দ্রুত ধসে যায়। শিবসা ও পশুর নদীর তীব্র স্রোতের কারণে মাটির রাস্তাগুলো স্থায়ী হচ্ছে না। টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া শুধু মাটি ফেলে রাস্তা সংস্কার করার কারণেই সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে কিন্তু মিলছে না স্থায়ী সমাধান।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভোটের আগে অনেক জনপ্রতিনিধিই রাস্তা পাকা করার এবং নদীভাঙন রোধের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচনের পর আর কেউ খোঁজ নেন না। আমরা শুধু একটা ভালো রাস্তা আর নদীর ভাঙন থেকে মুক্তি চাই।

“জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কেবল আশ্বাস না দিয়ে, দাকোপের এই ভৌগোলিক সংকটকে মাথায় রেখে নদীভাঙন রোধে ব্লক ও সিসি ওয়াল নির্মাণ করা এবং গ্রামীণ সড়কগুলোকে দ্রুত পিচ ঢালাই (পাকা) করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের আওতায় আনা। অন্যথায়, প্রতি বছর সরকারের বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ কেবল মাটির বুকেই হারিয়ে যাবে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না বলে দাবি স্থানীয়দের।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

টেকসই বেড়িবাঁধ ও পাকা রাস্তার প্রতীক্ষায় দাকোপ: সারা দেশ এগোলেও ভাগ্য বদলেনি উপকূলবাসীর

Update Time : ০২:০২:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

দাকোপ থেকে ফিরে, সোহাগ সরদার এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: (পর্ব-১)

চারিদিকে নদীবেষ্টিত খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপ। ভদ্রা, চুনকুড়ি, পশুর, ঢাকী, মাংগা, ঢাংমারী, ঝপঝপিয়া আর প্রমত্তা শিবসার মতো ছোট-বড় এক ডজন নদী বুকে নিয়ে বেঁচে আছে এই অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু এই নদীগুলোই এখন স্থানীয়দের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ। একদিকে শিবসা ও পশুর নদীর ভয়ংকর ঢেউ ও তীব্র স্রোতে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে জনপদ, অন্যদিকে উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর বেহাল দশা উপকূলবাসীকে ঠেলে দিয়েছে চরম ভোগান্তিতে।

বছরের পর বছর পার হলেও ভাঙনকবলিত টেকসই বেড়িবাঁধ এবং গ্রামীণ রাস্তাঘাট পাকা করার দাবি আলোর মুখ দেখেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ— জনপ্রতিনিধি বদলায়, কিন্তু গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার ভাগ্য বদলায় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে দুর্ভোগের শেষ নেই যেখানে উপজেলার সদর থেকে শুরু করে প্রান্তিক ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ সড়কেই এখন কাদার রাজত্ব। সরেজমিনে দেখা গেছে: সুতারখালী ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি রাস্তা এখনো কাঁচা। সামান্য বৃষ্টিতেই এই সড়কগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।তিলডাঙ্গা ইউনিয়নে কামিনীবাসিয়া এলাকার রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় থেকে গেছে। ইউনিয়নের অনেক জায়গায় রাস্তা করার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে কাজ না করে ফেলে রাখা হয়েছে।

এদিকে পানখালী ও কামারখোলা এই দুই ইউনিয়নের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম সড়কগুলো এখনো মাটির রাস্তা। বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়াও বাজুয়া ইউনিয়নের ওয়াপদা রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। নদী ঘেঁষে থাকা এই রাস্তাটি যেকোনো সময় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এমনকি গ্রামের কথা বাদ দিলেও খোদ উপজেলা পরিষদ এবং চালনা পৌরসভার চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। উপজেলা পরিষদের ঠিক সামনের প্রধান সড়কটির বেহাল দশা প্রশাসনিক কাজে আসা সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে চালনা পৌরসভার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাওয়ার রাস্তাটিরও চরম জরাজীর্ণ অবস্থা, যা স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের যাতায়াতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়দের মতে নদীভাঙন ও সড়ক টেকসই না হওয়ার কারণ, নদী ঘেঁষে রাস্তা থাকায় এবং শক্তিশালী গাইড ওয়াল বা টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় বর্ষা ও জোয়ারের পানিতে কাঁচা রাস্তাগুলো দ্রুত ধসে যায়। শিবসা ও পশুর নদীর তীব্র স্রোতের কারণে মাটির রাস্তাগুলো স্থায়ী হচ্ছে না। টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া শুধু মাটি ফেলে রাস্তা সংস্কার করার কারণেই সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে কিন্তু মিলছে না স্থায়ী সমাধান।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভোটের আগে অনেক জনপ্রতিনিধিই রাস্তা পাকা করার এবং নদীভাঙন রোধের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচনের পর আর কেউ খোঁজ নেন না। আমরা শুধু একটা ভালো রাস্তা আর নদীর ভাঙন থেকে মুক্তি চাই।

“জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কেবল আশ্বাস না দিয়ে, দাকোপের এই ভৌগোলিক সংকটকে মাথায় রেখে নদীভাঙন রোধে ব্লক ও সিসি ওয়াল নির্মাণ করা এবং গ্রামীণ সড়কগুলোকে দ্রুত পিচ ঢালাই (পাকা) করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের আওতায় আনা। অন্যথায়, প্রতি বছর সরকারের বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ কেবল মাটির বুকেই হারিয়ে যাবে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না বলে দাবি স্থানীয়দের।